ফিচার

অনিরাপদ পানি ব্যবহারে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি

জলবায়ু পরিবর্তন চ্যালেঞ্জ: পানি ও পরিবেশ
পরিবেশগত দূষণ, বিশেষত যারা জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে জড়িত তাদের উদ্ভব হয়েছে
দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে যদিও সাইন আপ করা সম্ভব হয়নি
দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের মত নিম্নোক্ত এলাকায় ইনফ্লুয়েঞ্জা রয়েছে,
পানির সংকট, নদী ভাঙ্গন, পরিবেশগত দুর্যোগের কার্যকর প্রতিরোধ, দূষণ
শিল্প বর্জ্য দিয়ে, দ্রুত নগরায়নের পরিণতি, ভূগর্ভস্থ পানির গুণমান,
আর্সেনিক দূষণ, দুর্বল কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ইনফ-সিআইটি ক্লিনিকাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা,
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদী দূষণ, কীটনাশক ক্ষতিকর প্রভাব, লিঙ্গ প্রসঙ্গে স্থিতিশীলতা
জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত গবেষণা থেকে বাধা, শিশু স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত
পরিচ্ছন্নতা, বেঁচে থাকার জন্য সুন্দরবন সংগ্রাম, পরিবেশগত শিক্ষা। এই সমস্ত থিমগুলি
দেশের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটি আভাস দিন।

নিরাপদ পানির গুরুত্ব উপলব্ধি করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১৭টির মধ্যে প্রথমটিই নির্ধারিত হয়েছে পানি-সংশ্লিষ্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশের মানুষ ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে।

রাস্তাঘাট ও বাজার থেকে আমরা কী পানি কিনে খাচ্ছি, যে পানিকে আমরা ‘বিশুদ্ধ’ নামের দূষিত পানি পান করছি? তাতেই যদি এই অবস্থা দেখা যায়, তাহলে ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনা’ কতটা যে সঠিক, তা বলাই বাহুল্য। আমরা মনে করি, বৃহত্তর ব্যবস্থাপনার আগে সুপেয় পানির সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই হবে। সেই পানি নিয়েই এখন চলছে প্রতারণা ও বাণিজ্য! ওয়াসা নগরবাসীর জন্য যে পানি সরবরাহ করছে তার মানও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। ঢাকা ওয়াসা যে পানি সরবরাহ করে থাকে তাকে পুরোপুরি সুপেয় পানি বলা যাবে না। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, ওয়াসা যেসব জায়গাকে পানির উৎস হিসেবে ব্যবহার করে তা এতটাই দূষিত যে পরিশোধনের পরও স্বাভাবিক অবস্থায় আসে না। এ ছাড়া ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টেও (পানি শোধনাগার) সঠিকভাবে পরিশোধন হয় না। পানি দুর্গন্ধমুক্ত করতে যে কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় তা নিয়েও আরেক সমস্যা। পরিমাণে বেশি ব্যবহার করলে পানিতে কেমিক্যালের গন্ধ থাকে। আর পরিমাণে কম দিলে পানিতে দুর্গন্ধ থাকে। সব কিছু মিলিয়ে পানি সরবরাহের বিষয়টি নিয়ে ওয়াসার আরো যুগোপযোগী চিন্তাভাবনা করার এখনই সময়।

বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার বিষাক্ত হয়ে পড়া পানি শোধন করতে মেশানো হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত ক্লোরিন, লাইম (চুন) ও অ্যালাম (ফিটকিরি)। ফলে শোধনের পর অনেক সময় পানিতে ক্লোরিনের গন্ধ পাওয়া যায়। আবার পুরনো পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করায় পানিতে অনেক সময় দুর্গন্ধ পাওয়া যায়। কিছু এলাকায় পাইপলাইনে ফুটা করে অবৈধভাবে পানির লাইন দেয়া হয়েছে। সেসব ফুটা দিয়ে ময়লা-আবর্জনা প্রবেশ করে পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে ফোটানোর পরও সেই পানি দূষণমুক্ত করা যাচ্ছে না।

যদিও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বরাবরই তাদের সরবরাহ করা পানির মান নিয়ে সব আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়। ওয়াসার পানির পাইপলাইন লিকেজ হয়ে তাতে স্যুয়ারেজ লাইনের ময়লা পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা থাকায় আমরা সাধারণ মানুষ অনেকেই নিরাপদ ভেবে ব্যবহার করছি জারের পানি। কিন্তু সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে, জারের পানি বিক্রি করে বিভিন্ন পানি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান দুই হাতে টাকা আয় করলেও জারের পানি জনস্বাস্থ্যের জন্য মোটেই নিরাপদ নয়।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) একদল গবেষক জানিয়েছেন, রাজধানীর বাসাবাড়ি, অফিস-আদালতে সরবরাহ করা ৯৭ ভাগ জারের পানিতে ক্ষতিকর মাত্রায় মানুষ ও প্রাণীর মলের জীবাণু ‘কলিফর্ম’ রয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই জার ভর্তি পানি জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা মারাত্মক ও হুমকিস্বরূপ। বিশুদ্ধ পানির নামে অপরিশোধিত পানি সরবরাহের রমরমা ব্যবসা চলছে খোদ রাজধানীসহ সারা দেশেই। এসব কি দেখার কেউ নেই? কার কাছে উত্তর জানতে চাইব?

গবেষকদের মতে, পানিতে টোটাল কলিফর্ম ও ফেকাল কলিফর্মের পরিমাণ শূন্য থাকার কথা, সেখানে ৯৭ ভাগ জারের পানিতেই দুটো জীবাণুর উপস্থিতি রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কলিফর্ম মূলত বিভিন্ন রোগ সৃষ্টিকারী প্যাথোজেন যেমন, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও প্রোটাজেয়ার সৃষ্টিতে উৎসাহ জোগায় বা সৃষ্টি করে। বিভিন্ন রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া মানবদেহে নানাবিধ রোগ সৃষ্টি করে ক্রমাগত মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। ফলস্বরূপ পরবর্তী সময়ে যে কোনো রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীব দ্বারা এই দেহ খুব সহজেই আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়। আমরা জানি, সব মরণব্যাধির জন্ম দেয় দূষিত পানি। ডায়রিয়া, কলেরা, ক্যান্সার, হেপাটাইটিস, টাইফয়েট, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগের মূল কারণ এই দূষিত পানি। ঢাকাসহ সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভায় সরবরাহ করা পানি সাপ্লাই লাইন দূষিত। বোতল বা জারজাত পানির ৯০ ভাগই বিশুদ্ধ নয়। এমন ভয়াবহ চিত্র দেখতে পাচ্ছি। কেবল জারের পানিতে প্রাণঘাতী জীবাণুর উপস্থিতিই নয়, বাজারে থাকা বিভিন্ন কোম্পানির বোতলজাত পানিতেও বিএসটিআই নির্ধারিত মান না পাওয়ার তথ্য রয়েছে।

কারণ ১৬ কোটি মানুষের দেশটিতে ৯৮ ভাগের জন্য পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা হলেও বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে না পারা এবং মৌসুমভেদে পানি সংকটের কারণে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিঘ্নিত হচ্ছে। জনগণের বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পূরণ করার জন্য সরকারের ১৩টি মন্ত্রণালয়ের ৩৫টি সংস্থার নানা উদ্যোগের কথা শুনেছি কিন্তু বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর অন্যতম কারণ তাদের মধ্যে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের বড় অভাব। এর সুযোগ নিচ্ছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। বিশুদ্ধ পানির নামে জারে করে অপরিশোধিত ও দূষিত পানিই তারা বিক্রি করছে চড়া দামে। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অপরিহার্য শর্ত হলো নিরাপদ সুপেয় পানি এবং ভেজালমুক্ত খাদ্য। এটা নিশ্চিত করা মূলত সরকারের দায়িত্ব। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে সরকারের বিভাগ রয়েছে, জনবল রয়েছে। বাজারজাত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদের কাজটা কী? যেসব অসাধু ব্যবসায়ী বিশুদ্ধ পানির নামে দূষিত মানহীন পানি বাজারজাত করছে, তাদের অবশ্যই প্রতিরোধ করতে হবে, শাস্তির আওতায় আনতে হবে। পানির ন্যূনতম মান বজায় রাখতে পানি পরিশোধন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানো ও নজরদারির বিকল্প নেই। চালাতে হবে জনসচেতনতামূলক প্রচারণাও।

ধন্যবাদ

প্রকৌশলী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন

সভাপতি

বাংলাদেশ নিরাপদ পানি আন্দোলন

আরও সংবাদ