খেলাধুলা জাতীয়

যুবাদের স্বর্ণালি দিন

চারপাশে তখন হাজার হাজার টাইগারভক্তের সশব্দ উচ্ছ্বাস রেণু ছড়াচ্ছে বিদায়ী শীতের মধুর সন্ধ্যায়। ভক্তদের সেই মিছিল বিকেলে বিমানবন্দরে বিশ্বজয়ী বীরদের প্রাণের উচ্ছ্বাসে বরণ করে নেয়ার মধ্য দিয়ে শুরু।

মোটরশোভাযাত্রা শোভিত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নদের বহনকারী বিশেষ বাস মিরপুর রওনা হওয়ার আগে শাহজালালে ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত হন যুবা টাইগাররা। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল ও বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান ফুলের তোড়া তুলে দেন অধিনায়ক আকবর আলীর হাতে। রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার ভক্ত হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান বিজয়ীদের।

মাঘের এমন মদির, মাদকতা ছড়ানো সন্ধ্যা মিরপুরে আগে কখনও কি এসেছে? এমন আবির রাঙানো সন্ধ্যা? পশ্চিমে সূর্য ঢলে যাওয়ার পরও আলো ছেড়ে যায়নি শেরেবাংলা থেকে। রবিবাসরীয় পচেফস্ট্রুম থেকে যে আলোর ডালি সাজিয়ে ‘আকবর দ্য গ্রেট’ নিয়ে এলেন ঢাকায়।

রুপালি ট্রফি সামনে রেখে কেক কাটলেন আকবররা। আতশবাজির রোশনাই আর কনফেত্তির বর্ষণে ঘোরলাগা এক আবহ।

উচ্ছ্বাসের মাতাল হাওয়ায় আকবররা যেন হারিয়ে না যান, সেটা নিশ্চিত করতে আগামী দুই বছর বিশেষ প্রশিক্ষণের মধ্যে রাখা হবে তাদের। কাল রাতে সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান জানান, এ দুই বছরে প্রত্যেক ক্রিকেটারকে মাসে এক লাখ টাকা করে দেয়া হবে। যুবাদের জন্য অপেক্ষা করছে আরও বড় পুরস্কার। আগামী সপ্তাহে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রাষ্ট্রীয় গণসংবর্ধনায় সেই পুরস্কারের ঘোষণা আসতে পারে। আর সুপারস্টার হওয়া যাবে না, ওদের বলেছেন বিসিবি সভাপতি।

এই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় দুপুর থেকেই বিমানবন্দরের বাইরে ভক্ত-সমর্থকদের ঢল নেমেছিল। বিভিন্ন ব্যানার, ফেস্টুন, জাতীয় পতাকা নিয়ে তারা এসেছিলেন সোনার ছেলেদের বরণ করে নিতে। যাদের হাত ধরে এসেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অর্জন।

বিমানবন্দরেই আকবর আলী, তৌহিদ হৃদয়দের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল ও বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান। এ সময় বিসিবির সব পরিচালক ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে লাল-সবুজে সাজানো ‘ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন’ লেখা একটি বাসে করে আকবর, রাকিবুলদের নিয়ে যাওয়া হয় মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। বিমানবন্দর থেকে মিরপুরের পথে ক্রিকেটারদের বাসের সঙ্গে ছিল শত শত মোটরসাইকেল। পথজুড়েই সমর্থকদের ফুলেল শুভেচ্ছা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন ক্রিকেটাররা।

স্নায়ুক্ষয়ী ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে তিন উইকেটের ঐতিহাসিক জয়ের পর রোববার রাতে উৎসব হয়েছিল পচেফস্ট্রুমে। স্বপ্নের বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে আকবর আলীরা দেশে ফেরার পর বুধবার আরও বড় উৎসব হল মিরপুরে। বিমানবন্দরের মতো স্টেডিয়াম এলাকাও লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে আগে থেকেই।

অন্তত হাজারদশেক মানুষ ব্যানার, ফেস্টুন, জার্সি এবং জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন বিশ্বজয়ী বীরদের বরণ করে নিতে। আকবরদের বাস স্টেডিয়ামের সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষার অবসান ঘটে। ক্রিকেটাররা স্টেডিয়ামে আসার আগ পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসন দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় সামলাচ্ছিল।

কিন্তু আকবররা স্টেডিয়ামে প্রবেশ করার পর সেই ভিড় সামলাতে পারেনি পুলিশ। হুড়মুড়িয়ে দর্শকরা প্রবেশ করে স্টেডিয়াম চত্বরে। এরপর অবশ্য দর্শকদের জন্য খুলে দেয়া হয় স্টেডিয়ামে গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড গ্যালারির গেট। দর্শকরা বিশ্বজয়ী বীরদের বরণের জন্য চলে যায় গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডে।

বিসিবি কার্যালয় থেকে স্টেডিয়ামে নেমে আসার পথে আগে থেকেই বিছানো ছিল লাল গালিচা। আন্তর্জাতিক ম্যাচ শেষে যে জায়গায় পুরস্কার বিতরণ করা হয়, সেখানে রাখা ‘ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন’ লেখা ব্যাকড্রপ। যার ঠিক সামনেই টেবিলে সাজানো ‘বিশ্বচ্যাম্পিয়ন’ লেখা কেক।

বিসিবি কার্যালয়ে বোর্ড সভাপতির সঙ্গে বৈঠকের পর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আকবর আলীরা লাল গালিচা দিয়ে সেই জায়গায় পৌঁছান। আনা হয় বিশ্বকাপের ট্রফিটি। এরপর বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান ও যুব দলের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক আকবর আলী একসঙ্গে ট্রফি উঁচিয়ে অংশ নেন ফটোসেশনে।

দুই কেকের মাঝখানে রাখা হয় ট্রফি। তারপর কেক কেটে উদযাপন। আকবরের গর্বিত বাবা মোহাম্মদ মোস্তফাও উপস্থিত ছিলেন বিসিবির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। নিজের হাতে তাকে কেক খাইয়ে দেন বিসিবি সভাপতি। বোর্ডের এত বড় আয়োজন, তাদের ঘিরে দেশের মানুষের এত উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে বিস্মিত অধিনায়ক আকবর।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘ধারণা করেছিলাম বাংলাদেশে এলে বড় কিছু হবে। তবে এত বড় কিছু হবে, ভাবতে পারিনি। আমাদের এই বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে দেশের ক্রিকেটকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যাত্রা শুরু হল।’

গত ৩ জানুয়ারি অনেকটা নীরবেই দেশ ছেড়েছিলেন আকবর আলীরা। এক মাস আট দিনের দীর্ঘ সফর শেষে ফেরার পালায় সম্পূর্ণ ভিন্নচিত্র। অন্যরকম উৎসব। এবার যে বিশ্বজয়ী বীরদের বরণ করে নিল বাংলাদেশ। বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী দলকে বহনকারী এমিরেটস এয়ারলাইনসের ফ্লাইটটি অবতরণ করে ঢাকায়।

বিসিবি সভাপতি জানান, ‘আমরা তো এর আগে অনেক কিছু করেছি। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছি, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল খেলেছি। প্রায় সব বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সঙ্গে সিরিজ জিতেছি। কিন্তু এর কাছে সেসব সাফল্য কিছুই না। বিশ্বকাপ, বিশ্বকাপই।’

সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে কাল রাতে বিসিবি সভাপতির সঙ্গে নৈশভোজ করেন ক্রিকেটাররা। বিসিবির ব্যবস্থাপনায় অনেকেই কাল রাতে ফিরে গেছেন আপনালয়ে। বাকিরা আজ সকালে ফিরে যাবেন যে যার পরিবারের কাছে।

আরও সংবাদ